বাংলাদেশে হিন্দু সংস্কৃতির জোয়ারঃ বাঙালী মুসলিম কি ভেসেই যাবে? Print
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Monday, 16 April 2018 05:21

বর্ষবরণের নামে পূজা

পূজা মন্ডপ এখন আর মন্দিরে নয়, ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে। নানা রংয়ের নানা জীব-জন্তুর মুর্তি মাথায় নিয়ে যারা মিছিলে নেমেছে তারাও কোন মন্দিরের হিন্দু পুরোহিত  বা হিন্দু পূজারি নয়। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম রূপে। এ চিত্রটি এখন আর শুধু ঢাকা শহরের নয়, সরকারি খরচে সেটিই সারা বাংলাদেশ জুড়ে হচ্ছে। কথা হলো, এতে কি কোন মুসলিম খুশি হতে পারে? যার মনে সামান্যতম ঈমান অবশিষ্ঠ আছে তার অন্তরে তো এ নিয়ে বেদনাসিক্ত ক্রন্দন উঠতে বাধ্য। কারণ, এ তো কোন সুস্থ্য সংস্কৃতি নয়। নির্দোষ কোন উৎসবও নয়। এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উৎসব। এটি তো সিরাতুল মুস্তাকীম ছেড়ে জাহান্নামের পথে চলা অসংখ্য মানুষের ঢল। এটি তো পৌত্তলিকদের পূজা মন্ডপ রাজপথে নামানোর মহা-উৎসব। এ উৎসব তো শয়তানের বিজয়ের। এবং সেটি মুসলিমদের রাজস্বের পয়সা। আরো পরিতাপের বিষয়, ইসলামের সংস্কৃতি ও অনুশাসনের বিরুদ্বে এ উদ্ধত শয়তানী বিদ্রোহের পাহারাদারে পরিণত হয়েছে দেশের পুলিশ ও প্রশাসন।

 

প্রশ্ন হলো, যে দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম সে দেশে কি কখনো এরূপ পূজামন্ডপ মাথায় নিয়ে মিছিল হয়? বিশ্বের কোন মুসলিম দেশে কি সেটি হয়? এ কাজ তো মুরতাদদের। এতে আনন্দ বাড়ে একমাত্র পৌত্তলিক কাফেরদের। জাহান্নামের পথে ছুটে চলা এরূপ অসংখ্য মিছিলে লক্ষ লক্ষ সতীর্থ দেখে পৌত্তলিকদের মনে আনন্দের প্রচণ্ড হিল্লোল উঠবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সে আনন্দেরই প্রকাশ ঘটেছে ১৫ই এপ্রিল কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকায়। এটি যে হিন্দুর পূজা মন্ডপ নিয়ে মিছিল -তা নিয়ে কোন পৌত্তলিকের সন্দেহ হওয়ার কথা নয়। সন্দেহ হয়নি আনন্দবাজার পত্রিকারও। তাই পত্রিকাটির রিপোর্টঃ “কার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে! কখনও মনে হচ্ছিল কলকাতার কলেজ স্কোয়ার বা একডালিয়ার পুজো মণ্ডপ। কখনও বা শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের চেহারা। তা সে রমনার বটমূলের বৃন্দগানই হোক কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাজপথে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পুজো, বসন্ত উৎসবের মিলমিশে একাকার ঢাকার নববর্ষের সকাল।”

আনন্দ বাজার পত্রিকা রাজপথের একজন অতি উৎসাহীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে,‘‘এটাই এখন আমাদের জাতীয় উৎসব। যেখানেই থাকি ঠিক চলে আসি।’’ প্রশ্ন হলো, এমন পূজার মন্ডপ নিয়ে মিছিল বাঙালী মুসলিমের জাতীয় উৎসব হয় কি করে? কোনটি জাতীয় উৎসব এবং কোনটি নয় -সেটি কে নির্ধারণ করবে? সে ফয়সালা দিবে কি ইসলামবিরোধী এ বিদ্রোহীগণ?  এর পিছনে সরকারের বিনিয়োগ কতখানি সে বর্ণনাও দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। লিখেছে, “হেলিকপ্টার থেকে ফুল ছড়িয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দড়ির ব্যারিকেড দিয়েও উৎসাহী জনতাকে ঠেকাতে পারছেন না। অষ্টমীর রাতে কলকাতায় যেমন হয়। শোভাযাত্রায় মন্ত্রী-সান্ত্রি সবাই ছিলেন। শোভাযাত্রা ঘিরে থিকথিক করছিল পুলিশ। শুক্রবার রাতে দেখছিলাম রাস্তায় ছেলেমেয়েরা ভিড় করে আলপনা দিচ্ছেন। গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেমনটা এখন পুজোর সময়ে কোনও কোনও রাস্তায় হয়।”

পুরা আয়োজন যে ছিল পূজার সেটি অনেক বাঙালী মুসলিমের নজরে না পড়লেও আনন্দবাজারের হিন্দু সাংবাদিকের নজরে ঠিকই ধরা পড়েছে। তাই তিনি লিখেছেন,“শুধু পুজো নয়, কলকাতার সরস্বতী পুজো, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র মেজাজও যেন ধরা পড়ল বাংলাদেশের এই নববর্ষে! জাতি-ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে এ যেন সর্বজনীন উৎসব।’’ প্রশ্ন হলো, হিন্দুর পূজা কি কখনো ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে ইসলামের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে পারে? হিন্দুর পূজা কি মুসলিম সন্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়? অথচ সে চেষ্টাই হচ্ছে জনগণের রাজস্বের অর্থে। সরকারের এজেন্ডা, হিন্দুর সে পূজাকেই বাংলাদেশে সার্বজনীন করা। বাংলাদেশের সরকার যে সে এজেন্ডা নিয়ে বহু কিছু করেছে এবং বহু দূর অগ্রসর হয়েছে, তাতেই আনন্দবাজারের মহা-আনন্দ। সে আনন্দটি মূলতঃ ভারত সরকারেরও। বাংলাদেশে তারা তো তেমন একটি সরকারকেই যুগ যুগ ক্ষমতায় রাখতে চায়।

স্ট্রাটেজী: ইসলাম প্রতিরোধের

আনন্দবাজার একই দিনে আরেকটি রিপোর্টে ছেপেছে, সেটি “মৌলবাদকে পথে নেমে মোকাবিলা বাংলাদেশে” শিরোনামে। তাতে শেখ হাসিনার প্রশংসায় পত্রিকাটি অতি গদগদ। মৌলবাদ চিত্রিত হয়েছে ইসলাম নিয়ে বাঁচার সংস্কৃতি ও তা নিয়ে রাজনীতি। যারা ইসলামের প্রতি সে অঙ্গিকার নিয়ে বাঁচতে চায় তারা চিত্রিত হচ্ছে “অন্ধকার অপশক্তি” রূপে।  তাই তাদের কাছে প্রতিটি ইসলামি দলই হলো অপশক্তি –সেটি যেমন জামায়াতে ইসলামী, তেমনি হেফাজতে ইসলাম। এমন কি বিএনপি’ও। ইসলামি শক্তির মোকাবেলায় নববর্ষের মতো একটি অনুষ্ঠানকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়ায় পত্রিকাটি প্রচণ্ড খুশি। লক্ষ্য এখানে বাঙালী মুসলিমদের হিন্দু বানানো নয়, বরং তাদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। তাই নেমেছে সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের ব্যানারে। ইসলামের বিশ্বব্যাপী জাগরণের প্রতিরোধে এটি মূলতঃ আন্তর্জাতিক সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের অংশ। ইসলাম বিরোধী এ আন্তর্জাতীক কোয়ালিশন শুধু যে স্ট্রাটেজীক পরিকল্পনা দিচ্ছে তা নয়, সে স্ট্রাটেজীর বাস্তবায়নে বিশ্বের তাবদ কাফের শক্তি শত শত কোটি টাকার অর্থও দিচ্ছে। সরকারি অর্থের পাশাপাশি এ বিদেশী অর্থে বিপুল ভাবে বেড়েছে মিছিলের সংখ্যা ও জৌলুস। মিছিলে মিছিলে ছেয়ে গেছে সমগ্র দেশ। আল্লাহর স্মরণ ভূলিয়ে দেয়ার এর চেয়ে সফল হাতিয়ার আর কি হতে পারে? আল্লাহর স্মরণ থেকে এরূপ বিস্মৃত  হওয়ার ভয়ানক শাস্তিটি হলো তখন শয়তানকে সঙ্গি রূপে বসানো হয় অবাধ্য ব্যক্তির ঘাড়ে। যার প্রতিশ্রুতি্ এসেছে সুরা যুখরুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে নেমেছে যেমন জাতিসংঘ, তেমনি ইউনেস্কো। তাই ইউনেস্কো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’-এর পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে নববর্ষের ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। ইসলাম-দমন প্রকল্পের অংশ রূপেই সিলেবাস থেকে বাদ দেয়া হয়েছে কোরআন-হাদীসের পাঠ, নিষিদ্ধ হয়েছে পিস টিভি ও ইসলামী টিভি চ্যানেল এবং জেলে ঢুকানো হয়েছে বিখ্যাত মোফাচ্ছেরদের। সে সাথে  বন্ধ করা হয়েছে তাফসির মাহফিল এবং ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। শত শত কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে দেশী-বিদেশী এনজিওদের ডুগি, তবলা ও হারমনিয়াম দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নাচগান শেখাতে।

ইসলামে শত্রুপক্ষের মতলব গোপন নয়। ঘোষণা দিয়েই তারা মাঠে নেমেছে। তারা আঘাত হানতে চায় ইসলামের তাওহীদের মূলে। তাদের স্পর্ধা এতটাই বেড়েছে যে, উপাস্য রূপে খাড়া করেছে মহাপ্রভূ আল্লাহতায়ালার বদলে মানুষকে। ১৫ই এপ্রিলে অঞ্জন রায় নামক ব্যক্তি দৈনিক আনন্দ বাজারে রিপোর্ট করেছেঃ “সেই কবে এই জনপদের কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার গ্রামের আখড়ায় ফকির লালন সাঁইজি উচ্চরণ করেছিলেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সেই উচ্চারণকে ধারণ করেই সত্যিকারের মানুষ হওয়ার বিষয়ে এ বারের শপথ ছিল ঢাকায়, বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। মানুষের ভিড়ে এ বারের শোভাযাত্রার মিছিল হয়ে উঠেছিল মহামিছিল। সেই পুরনো পোশাকের ঢাকিরা সার বেধে বোল তুলেছেন ঢাকে। তালে তালে নাচছে শিশু থেকে বৃদ্ধ। জানান দিচ্ছে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সব মানুষের উৎসব পয়লা বৈশাখের অমিত শক্তির কথা।”

পত্রিকাটি সোনার মানুষ হওয়ার পথও বাতলিয়ে দিয়েছে। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার ইবাদতের পথ নয়, সেটি মানুষের উপাসনা। এটি  একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে কতবড় সাংঘাতিক কথা? নবী-রাসূল নয়, পথ-প্রদর্শক রূপে পেশ করা হয়েছে লালন শাহকে। লালন শাহ মুসলিম ছিল, এক আল্লাহর উপাসক ছিল বা তার জীবনে নামায-রোযা ছিল -তার কোন প্রমাণ নাই। তার মত এক পথভ্রষ্টকে পেশ করা হয়েছে বাঙালীর পথের সন্ধানদাতা রূপে। এরূপ পথভ্রষ্টতাকে প্রতিষ্ঠা দিতে সরকারের বিনিয়োগও কি কম? অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির নামে নানা ভাবে এই পথভ্রষ্ট লালনকেই  সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে্।

ইসলামের পক্ষের শক্তি কি অপশক্তি?

আনন্দ বাজার বড় আনন্দভরে উল্লেখ করেছে, “অন্ধকার অপশক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিমান বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সেই ধারণাকে ধারণ করেই আয়োজিত হয়ে চলেছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার। প্রায় প্রত্যেকের হাতে বিশাল আকারের মুখোশ, শোলার সেই প্রাচীন রূপকথার পাখি, টেপা পুতুল, বিভিন্ন মঙ্গল প্রতীক।” কিন্তু কারা সে অপশক্তি সেটি আনন্দ বাজার প্রকাশ না করলেও গোপন থাকেনি। বাংলাদেশে চলছে বর্বর স্বৈরাচারি শাসন। চলছে লাগামহীন সরকারি ও বেসরকারি সন্ত্রাস। চলছে ব্যাংক লুট, ট্রেজারি লুট। ঘটছে শত শত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। অন্য কোন দেশের চেয়ে বেশী খরচে রাস্তা গড়লেও অর্থলুটের কারণে সে রাস্তা বেশী দিন টিকে না। খারাপ রাস্তার জন্য বাংলাদেশ এখন রেকর্ড গড়ছে। দূর্নীতিতে বাংলাদেশ ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-আদালত ভয়ানক অপশক্তির দখলে। নির্বাচন ছিনতাইয়ের মাধ্যমে এক বর্বর ফ্যাসিবাদী শক্তি এখন ক্ষমতায়। তাদের কারণে সম্ভব নয় একটি নিরপক্ষ নির্বাচন। তারা অসম্ভব করে রেখেছে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিল। কিন্তু আনন্দবাজার পত্রিকায় যারা অপশক্তি রূপে চিত্রিত হয়েছে তারা কিন্তু এসব দানবীয় অপশক্তিগুলি নয়। বরং দখলদার স্বৈরাচারি অপশক্তি প্রশংসা কুড়িয়েছে আনন্দ বাজার পত্রিকার। তাদের কাছে অপশক্তি হলো তারা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে ইসলামি চেতনার প্রচার ও প্রতিষ্ঠা চায়। রাজনীতির এ অঙ্গণে ভারতের পৌত্তলিক কাফের ও বাংলাদেশের ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা একাকার হয়ে গেছে।

আনন্দ বাজারের আরো পত্রিকার রিপোর্ট, “শোভাযাত্রায় একটাই শপথ -মানুষের মধ্যে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার যে আকাঙ্ক্ষা, প্রতিপাদ্যে সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চায় মঙ্গল শোভাযাত্রা,’’-এমনটাই বললেন শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। ‘‘এই উপস্থিতিই আশাবাদ,’’ এমনই বললেন বাংলাদেশের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক গোলাম কুদ্দুস। তিনি বললেন, ‘‘বাংলাদেশের মানুষ কখনওই কোনও অপশক্তির কাছে মাথা নোয়ায়নি। আর ভয়কে জয় করে চলার যে পথ, সেটিই বাঙালির পথ। এ বারের শোভাযাত্রায় যে মানুষের ঢল, সেটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশ পথ হারায়নি, অন্ধকার কখনও শেষ কথা নয়।’’ সেটাই জানান দিল আজকের মানুষের মিলিত ঢল।

কি মিথ্যা অহংকার নিয়ে উচ্চারণ যে ‘‘বাংলাদেশের মানুষ কখনোই কোন অপশক্তির কাছে মাথা নোয়ায়নি”। প্রশ্ন হলো, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের অধীনে ১৯০ বছরের গোলামীর জীবনও কি অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের ইতিহাস? এতই যখন শক্তির বড়াই তবে ১৯৭১ য়ে বাংলার মাটিতে ভারতীয়দের ডেকে আনা হলো কেন? ভারতের সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া পুরা দেশ দূরে থাক একটি জেলাও কেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী থেকে স্বাধীন করতে পারলো না? আজ যে ফ্যাসীবাদী শক্তির অধিকৃতি, সেটিও কি গর্বের?  “বাংলাদেশ পথ হারায়নি” বলেই বা আয়োজকগণ কি বুঝাতে চান? সেটি কি পূজামন্ডপ নিয়ে মাঠে নামার পথ?

এটিই কি সেই একাত্তরের চেতনা?

‘কি সেই একাত্তরের চেতনা’ –শেখ মুজিব কখনো সেটি বলেননি। তবে না বললেও চেতনার বিষয়টি কখনোই গোপন থাকে না। চেতনা তো সেটিই যা ধর্ম-কর্ম, আচার-আচরণ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রকাশ পায়। বলা হয় পবিত্র কোরআনের তাফসির হলো নবীজী (সাঃ)র নবুয়ত-পরবর্তী জীবন। তাই তাঁকে বাদ দিলে ইসলামি চেতনার পরিচয় মেলে না। বিশুদ্ধ ইসলামি চেতনাটি তো প্রকাশ পেয়েছে নবীজী (সাঃ)র ইবাদত-বন্দেগী, আচার-আচারণ, কর্ম, রাজনীতি, বিচার-ব্যবস্থা ও জিহাদের মধ্য দিয়ে। প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ ও তাঁর জীবন-ইতিহাস সামনে থাকার কারণে কোন কালেই ইসলামের চেতনা বুঝতে মুসলিমদের অসুবিধা হয়নি। চেতনা নিয়ে সে স্বচ্ছতার কারণেই দেশে দেশে যারাই ইসলাম কবুল করেছে তারাই নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে যেমন আত্মনিয়োগ করেছে, তেমনি আত্মসমর্পণ করেছে শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, খেলাফা, মুসলিম একতা ও জিহাদের বিধানগুলির কাছে। যার মধ্যে এসবে আগ্রহ নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে যেমন ঈমান নাই, তেমনি ইসলামি চেতনাও না্ই।

তেমনি একাত্তরের চেতনা বুঝতে হলে সে চেতনার যারা ধারক তাদের ধর্ম-কর্ম, আচার- আচরণ, রাজনীতি ও চরিত্রকে বুঝতে হয়। নিঃসন্দেহে শেখ মুজিব হলো একাত্তরের চেতনার মূল নায়ক। তাকে বাদ দিলে একাত্তরের চেতনা বাঁচে না। লেলিনকে বাদ দিয়ে যেমন লেলিনিজম বুঝা যায় না, তেমনি মুজিবকে বাদ দিয়ে একাত্তরের চেতনারও পরিচয় মেলে না। আজও যারা বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় তাদের কেউই রাজাকার নন। তাদের প্রচণ্ড অহংকার একাত্তরের চেতনা নিয়ে। তাই সে চেতনার সন্ধান মিলে বর্তমানে যারা বাংলাদেশের শাসন-ক্ষমতায় তাদের ধর্ম-কর্ম, চরিত্র ও রাজনীতি থেকে। তারাই মূলতঃ একাত্তরের বিজয়ী রাজনীতির মূলধারার প্রতিনিধি। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শত শত জীবন্ত তারাকা থাকার পরও কি সে চেতনা নিয়ে অজ্ঞতা চলে?

বাংলার রাজনীতিতে আজ সে স্বৈরাচার এবং যে বাকশালী স্বৈরাচার শেখ মুজিব নিজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন -সেটি কি কোন রাজাকারের সংস্কৃতি? পাকিস্তান আমলে কোন সময়ই  এক দলীয় বাকশালী স্বৈরাচার ছিল না। এটি নিরেট একাত্তর পরবর্তী ঘটনা। এবং এর প্রবর্তক খোদ শেখ মুজিব। ফলে এ স্বৈরাচারকে একাত্তরের চেতনা থেকে আলাদা করার উপায় নাই। আজও যে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চেপে বসেছে সেটিও বাকশালী স্বৈরাচারের ধারাবাহিকতা মাত্র। একাত্তরের চেতনার আরেকটি অবিচ্ছেদ্দ উপাদান হলো ভারত-নির্ভরতা ও ভারত-সেবী রাজনীতি। সে চেতনাটিও আজ বেঁচে আছে শেখ হাসিনার রাজনীতি। তাই একাত্তরে যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনা হয়, আজও তেমনি ভারতকে অবাধে ট্রানজিট দেয়া হচ্ছে। দেশের রাজপথে পূজার সংস্কৃতির জয়জয়াকার সেটিও কোন রাজাকারের সংস্কৃতি নয়। এটিও একাত্তরের চেতনাধারীদের সংস্কৃতি। এ চেতনা ভারতকে দিয়েছে বাংলাদেশের উপর তার সাংস্কৃতিক আধিপত্য।

 

একমাত্র পথ মুক্তির

একাত্তরের চেতনাধারীগণ বাংলাদেশকে কোন দিকে নিতে চায় সেটি আজ আর গোপন বিষয় নয়। বাঙালী মুসলিমদের সামনে এখন পথ মাত্র দু’টি। এক). বিদেশী প্রভূদের সাথে মিলে একাত্তরের চেতনাধারীগণ বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিত যে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করেছে তাতে ভেসে যাওয়া। বহু মানুষ ভেসে যাওয়ার সে পথকেই যে বেছে নিয়েছে সেটি পহেলা বৈশাখের বিশাল মিছিলই বলে দেয়। দুই). স্রোতে না ভেসে প্রবল বিক্রমে প্রতিরোধে নামা। এটিই মূলতঃ ঈমানদারীর পথ। গাছের মরা পাতার ন্যায় স্রোতে ভাসাটি কোন মুসলিমের সংস্কৃতি নয়। মুসলিম তো সে ব্যক্তি, যার মধ্যে থাকে স্রোতের বিপরীতে সামনে চলার ঈমানী বল। সে ঈমানী বলে সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে তারা সৃষ্টি করে নতুন স্রোত। মু’মিনের জীবনে সেটিই তো জিহাদ। সে ঈমানের বলের জন্যই ঈমানদার ব্যক্তি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পুরস্কার পায়। প্রশ্ন হলো, ঈমান, স্বাধীনতা ও জান্নাতের আশা নিয়ে বাঁচতে হলে এ ছাড়া কি বিকল্প পথ আছে?  ২রা বৈশাখ, ১৪২৫ (১৬/০৪/১৮)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites