Home •বাংলাদেশ বাংলাদেশে স্বৈরাচারের অধিকৃতি ও মৃত গণতন্ত্র
বাংলাদেশে স্বৈরাচারের অধিকৃতি ও মৃত গণতন্ত্র PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 15 July 2018 16:55

মৃত গণতন্ত্র

বাংলাদেশের মাটিতে গণতন্ত্র নির্মূলের যুদ্ধটি প্রথম শুরু করেন শেখ মুজিব। সে যুদ্ধে তিনি বিজয় লাভ করেন একদলীয় বাকশালের প্রতিষ্ঠা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানোর মধ্য দিয়ে। শেখ মুজিবের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ থামেনি। বরং সে যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বাকশালী চেতনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ শুধু জীবিত নয়, এক বিজয়ী আদর্শে পরিণত হয়েছে। চলমান এ যুদ্ধে তাদের প্রতিপক্ষ হলো জনগণ। তাদের লক্ষ্য স্রেফ দেশকে অধিকৃত রাখা নয়, জনগণকে পরাজিত এবং নিরস্ত্র রাখাও। আরো লক্ষ্য হলো, তাদের বিদেশী  প্রভু ভারতকে খুশি রাখা। স্বৈরশাসকগণ জানে, জনগণের মোক্ষম  অস্ত্রটি ঢাল-তলোয়ার বা গোলাবারুদ নয়, সেটি হলো ভোট। সে ভোট দিয়েই জনগণ তাদের ইচ্ছামত কাউকে ক্ষমতায় বসায়, কাউকে নামায় এবং কাউকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। গণতন্ত্রে জনগণের শক্তি তাই বিশাল। এ শক্তিবলে বড় বড় স্বৈরশাসককে জনগণ অতীতে আস্তাকুঁড়ে ফেলেছে। এজন্যই প্রতিটি স্বৈরশাসক গণতন্ত্রকে ভয় পায়। তারা জনগণের ভোটে ক্ষমতাচ্যুৎ হওয়া থেকে বাঁচতে চায়। তাদের লক্ষ্য তাই জনগণের হাত থেকে ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া। ফলে  স্বৈরশাসক মাত্রই গণতন্ত্রের চিরশত্রু। স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্র –এ দুটি কখনোই একই ভূমিতে একত্রে বাঁচে না; একটির বাঁচা মানেই অপরটির মৃত্যু। জনগণের ভোটের অধিকার, মিছিল-মিটিং করার অধিকার ও মৌলিক মানবিক অধীকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও নৃশংস সহিংসতা ছাড়া স্বৈরশাসনের মৃত্যু তাই অনিবার্য়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী বাকশালীদের লাগাতর ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের মূল কারণ তো এটিই।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে তিনবার কবরে পাঠিয়েছে। প্রথমে কবরে পাঠানোর কাজটি করেন শেখ মুজিব নিজে; সেটি সকল বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, মুজিবের হাতে গণতন্ত্র হত্যার সে গণবিরোধী গর্হিত কর্মটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে কোনদিনই নিন্দনীয় গণ্য হয়নি। বরং তাদের কাছে গণতন্ত্র হত্যার সে স্বৈরাচারি নায়ক গণ্য হয় শ্রেষ্ঠ আদর্শ রূপে, এমনকি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে! ফলে এতে প্রমান মেলে,গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থানটি স্রেফ মুজিবের একার ছিল না, সেটিই ছিল আওয়ামী লীগের দলগণ অবস্থান। দলটি দ্বিতীয়বার গণতন্ত্র হত্যার কাজটি করে ১৯৮২ সালে; সেটি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থণের মধ্য দিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, সামরিক অভ্যুত্থানকে নিন্দা করাই বিশ্বের তাবত গণতান্ত্রিক শক্তির রীতি। কারণ, সামরিক অভ্যুত্থানে কোন দেশেই গণতন্ত্র বাঁচেনি, বরং সামরিক অভ্যুত্থানই হলো দেশে দেশে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মূল হাতিয়ার। ফলে সামরিক জান্তাদের হাতে গণতন্ত্র হত্যার সে বর্বর কাজটিকে নিন্দার সামর্থ্য না থাকলে তাকে গণতন্ত্রী বলাটি মূলতঃ গণতন্ত্রের সাথে দুশমনি। গণতান্ত্রিক চেতনার মূল্যায়নে এটি হলো লিটমাস টেস্ট। কিন্তু সে টেস্টে আওয়ামী লীগ ফেল করেছে। কারণ, স্বৈরাচারি এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানকে আওয়ামী লীগ নিন্দা না করে বরং সমর্থন করেছে। এবং আজও গণতন্ত্র-হত্যাকারি স্বৈরাচারি এরশাদই হলো শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট রাজনৈতিক মিত্র। এ হলো আওয়ামী লীগের স্বৈরাচার প্রীতির নমুনা।

 

গণতন্ত্রকে তৃতীয়বার কবরে পাঠিয়েছেন দলটির বর্তমান নেত্রী শেখ হাসিনা। সেটি ২০১৪ সালে ভোট-ডাকাতি ও ভোটাবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে। সামরিক অভ্যুত্থানে যেমন গণতন্ত্র বাঁচে না, তেমনি ভোট-ডাকাতিতেও গণতন্ত্র বাঁচে না। ফলে কেয়ার টেকার গভর্নমেন্টের হাত ধরে যে গণতন্ত্র কবর থেকে ফিরে এসেছিল সেটি আবার হাসিনার হাতে নিহত ও কবরে শায়ীত। তবে ভোট ডাকাতি ও গণতন্ত্র হত্যাই শেখ হাসিনার একমাত্র অপরাধ নয়। তিনি তাঁর পিতার বাকশালকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক নতুন আঙ্গিকে। শেখ মুজিব সকল বিরোধী দলকে বিলুপ্ত করেছিলেন এবং নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্রপত্রিকা। শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলিকে বিলুপ্ত না করে বিলুপ্ত করেছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মৌলিক মানবিক অধিকার। কেড়ে নিয়েছেন সভাসমিতি, মিছিল, জনসংযোগের অধিকার। নিষিদ্ধ করেছেন আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলাম টিভি। ফলে বিরোধীদলগুলো নামে বাঁচলেও বিলুপ্ত হয়েছে সংসদ, রাজপথ ও মিডিয়া থেকে। গণতন্ত্র নির্মূলে শেখ হাসিনা তাঁর পিতা থেকেও বহু ধাপ এগিয়ে গেছেন। বিরোধী দলের মিটিংয়ে গুলি চালাতে ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যায় শেখ মুজিব কখনো সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেননি। সে কাজে তাঁর ছিল একটি মাত্র বাহিনী, সেটির নাম ছিল রক্ষিবাহিনী। কিন্তু শেখ হাসিনা রক্ষি বাহিনী না গড়ে সেনাবাহিনী, বিজিবী, পুলিশ ও RAB (রাপিড আকশন ব্যাটিলন)কে রক্ষিবাহিনীতে পরিণত করেছেন। ২০১৩ সালের ৫ই শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে গণহত্যায় গোলাবারুদ ও ভারী মেশিন গান নিয়ে সাত হাজারের বেশী সশস্ত্র সেপাই যোগ দিয়েছিল। তারা এসেছিল উপরুক্ত চারটি বাহিনী থেকে।

 

জনগণের ভোটাধীকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ঘৃণা কতটা তীব্র সেটি বুঝা যায় ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে। তাঁর অধীনে অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে সংসদের ১৫৩টি সিটে তিনি ভোটকেন্দ্র খোলার প্রয়োজন বোধ করেননি। ঘৃনা সব সময়ই ঘৃনার জন্ম দেয়। গণতন্ত্রের প্রতি শেখ হাসিনার মনে যে ঘৃণা তা জনগণের মনে প্রচণ্ড ভাবে জন্ম দিয়েছে তাঁর স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা। সে ঘৃণার তীব্র প্রকাশ ঘটেছে তার আয়োজিত নির্বাচন বয়কট করার মধ্য দিয়ে। ফলে ২০১৪ সালে যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছে, সেগুলিতে শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট দেয়নি। নির্বাচনের লক্ষ্য তো জনগণের রায় নেয়া। সেটি অর্জিত না হলে কি তাকে নির্বাচন বলা যায়? বিশ্বের আর কোন দেশে কোন কালেই কি এরূপ ভোটারহীন নির্বাচন হয়েছে? অথচ শেখ হাসিনা তো তাতেই খুশি। শেখ হাসিনার লক্ষ্য ছিল তাঁর দলের বিজয়, নির্বাচন কতটা সুষ্ঠ বা নিরপেক্ষ হলো এবং জনগণ তাতে কতটা অংশ নিল –তা নিয়ে তাঁর সামান্যতম আগ্রহ ছিল না। এ হলো তাঁর গণতন্ত্রের নমুনা। গণতন্ত্র হত্যায় আওয়ামী লীগ এভাবে স্বৈরাচারি এরশাদের চেয়েও বহুধাপ নিচে নেমেছে। ভোটারগণ তো তখনই ভোটকেন্দ্রে আসে যখন নির্বাচনে বিরোধীদল অংশ নেয়, নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হয় এবং তারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর বিজয়ে সম্ভাবনা দেখে। কিন্তু যে নির্বাচনের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য হলো, স্রেফ সরকারি দলকে যে কোন রূপে বিজয়ী করা –সে নির্বাচনে জনগণ ভোটকেন্দ্রে আসবে কেন? এজন্যই স্বৈরশাসকের আয়োজিত নির্বাচনগুলি নিতান্তই প্রহসন ও গণতন্ত্রের সাথে মশকরা ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

 

স্বৈরাচারঃ প্রতীক নৃশংস অসভ্যতার

সভ্যতার ন্যায় অসভ্যতার নিজস্ব আলামত আছে। সেটি শুধু জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় বনেজঙ্গলে বা গুহায় বসবাস নয়। বরং সে নিরেট অসভ্যতার প্রকাশ বাড়ি-গাড়ি, রাস্তাঘাট ও অফিস-আদালতে পরিপূর্ণ আধুনিক শহরেও হতে পারে। বন-জঙ্গলের ন্যায় এসব শহরেও তখন বিলুপ্ত হয় ন্যায়-নীতি, আইন-আদালত ও ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধ। অসভ্যতার সে আয়োজনে কাজ করে সন্ত্রাসের শক্তি। যার শক্তি আছে সে যাকে ইচ্ছা তাকে ধরতে পারে, গুম করতে পারে, খুন করতে এবং ধর্ষণও করতে পারে। রিমান্ডে নিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতনও করতে পারে। সে অসভ্যতায় এমন কি ৭-৮ বছরের বালিকাকে ধর্ষিতা হতে পারে। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে ধুমধামে শত নারী ধর্ষণের উৎসবও করতে পারে –যেমনটি শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসাতে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা করেছে। পত্রিকায় সে খবর ফলাও করে প্রকাশও পেয়েছে। এ অসভ্যতার আরো আলামত হলো, জঙ্গলে কেউ গুম, খুন বা ধর্ষিতা হলে যেমন বিচার বসে না, তেমনি আধুনিক অসভ্যতাতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন বিচার বসে না। তাই বাংলাদেশের রেকর্ড শুধু দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বচাম্পিয়ান হওয়ায় নয়, বরং দুর্বৃত্তদের বিচার না করারও।  জঙ্গলের অসভ্যতায় ভাল-ভালুকের সামনে ছাগল-ভেড়ার জীবনে নিরাপত্তা থাকে না। তেমনি স্বৈরাচারের অসভ্যতায় নিরাপত্তা থাকে না নিরীহ সাধারণ মানুষের -বিশেষ করে সরকারবিরোধীদের। আদিম অসভ্যতার ন্যায় এখানেও হুকুম চলে একমাত্র দলীয় প্রধান বা স্বৈরশাসকের। অন্যরা পরিণত হয় চাকর-বাকরে। রাষ্ট্রের অর্থ, অস্ত্র এবং সকল সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি পরিণত হয় স্রেফ স্বৈরশাসকের ত্রাস সৃষ্টির হাতিয়ারে।

 

তবে বন-জঙ্গলের অসভ্যতা ও স্বৈরাচারের অসভ্যতার মাঝে মৌলিক কিছু পার্থক্যও আছে। হিংস্র জন্তুর সহিংসতায় থাকে নিছক প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ। পেট পূর্ণ হলে তারা শিকার ধরে না। ফলে বনে জঙ্গলে লাশ পড়ে না এবং গণনির্মূলের ন্যায় পশুনির্মূলও হয় না। তাদের নৃশংসতায় তাই ভণ্ডামী নেই। অথচ সেটি থাকে স্বৈরাচারের অসভ্যতায়। তারা নৃশংসতায় নামে স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে নয়, বরং নিজেদের জুলুমবাজী বাঁচাতে। ফলে গুম, খুন, গণগ্রেফতার, গণহত্যা, গণনির্মূল –এসবই স্বৈরাচারি অসভ্যতার সহজাত সংস্কৃতি।  এবং থাকে সে নৃশংস অসভ্যতাকে একটি সভ্য রূপ দেওয়ার আয়োজন। সে অসভ্যতায় যেমন নিত্য নতুন আইন তৈরী করা হয়, তেমনি আদালত বসিয়ে বিচারের নামে প্রহসনও হয়। এসব কিছুই হয় বিরোধীদের নির্মূলের কাজকে বৈধতা দিতে। যেমন রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নৃশংস গণহত্যা ও উচ্ছেদের ন্যায় নিরেট অসভ্যতাকে আইনসিদ্ধ করতে মায়ানমারে আইন তৈরী করা হয়েছে। অনুরূপ রাষ্ট্রীয় অসভ্যতার কারণেই জার্মানীতে বহু লাখ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করাকেও আইনের শাসন বলা হয়েছে। তেমনি বাংলাদেশেও আইনের শাসন রূপে গণ্য হয়েছে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের শত শত কর্মীকে নিহত ও আহত এবং হত্যা শেষে তাদের লাশ গুম করার ন্যায় অসভ্যতা। একই রূপ আইনের শাসনের নাম করে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। সে লক্ষ্যে যেমন নতুন আইন তৈরী করা হয়েছে, তেমনি সে আইনের প্রয়োগে নতুন আদালতও বসানো হয়েছে। আইনের শাসনের দোহাই দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা-নেত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা খাড়া করা হচ্ছে। এভাবে আইন-আদালত ও প্রশাসন পরিণত হয়েছে স্বৈরাচারি অসভ্যতাকে দীর্ঘজীবী করার হাতিয়ারে।

 

কোয়ালিশন স্বৈরাচারি শক্তির

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো, কে দেশের শাসক হবে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নেয়া। সেটি না হলে মৃত্যু ঘটে গণতন্ত্রের। অথচ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে জনগণ সে রায় দেয়নি। ফলে তাতে গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যটি পূরণ হয়নি। এমন নির্বাচন বার বার হলেও তাতে গণতন্ত্র বাঁচে না। ফলে যারা ক্ষমতায় বসেছে তারা গণতন্ত্রের নিজস্ব সংজ্ঞায় পুরাপুরি অবৈধ। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে এবং সামান্যতম আত্মসম্মান থাকলে এমন প্রত্যাখ্যাত নির্বাচনকে ভিত্তি করে কেউ কি ক্ষমতায় বসতে পারে? আত্মসম্মান ও জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকাতেই ডাকাতগণ অন্যের গৃহে ঢুকে এবং তাদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। একই রোগ তো স্বৈর শাসকের। একই রোগ সামরিক জান্তাদেরও। তারাও জনগণের অনুমতি নিয়েই রাষ্ট্রের ঘরে ঢুকে। জনগণের শাসক রূপে নিজেদের ঘোষনা দেয়। ফলে জনগণের মৌলিক মানববিক অধিকারকে যারা সমর্থন করে তারা কখনোই স্বৈরাচারের পক্ষ নেয় না। পক্ষ নেয় না সামরিক স্বৈরশাসকেরও। অথচ বাংলাদেশ গণতন্ত্র মারা পড়েছে যেমন স্বৈরশাসকের অধীনে অনুষ্ঠিত ভূয়া নির্বাচনে, তেমনি সামরিক অভ্যুর্থানে। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যার সবগুলি অপরাধের সাথেই আওয়ামী লীগ জড়িত। এমন কি পাকিস্তানী আমলেও দলটির ভূমিকা আদৌ কম কদর্যপূর্ণ ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতারা ঢাকার প্রাদেশিক আইন পরিষদের ডেপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলিকে সহিংস ভাবে হত্যা করেছিল। এবং সে হত্যাকাণ্ডের তারা বিচার করেনি। লক্ষণীয় হলো, পাকিস্তানের অন্য কোন প্রদেশের আইন পরিষদের অভ্যন্তরে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কখনোই ঘটেনি; কারণ সেখান আওয়ামী লীগ ছিল না।

 

আওয়ামী বাকশালীদের বর্তমান যুদ্ধটি মূলতঃ সে সব বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যারা গণতন্ত্রকে কবর থেকে আবার ফিরিয়ে আনতে চায়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে শেখ হাসিনা কোয়ালিশন গড়েছেন এরশাদের ন্যায় এক সাবেক স্বৈরশাসকের সাথে। সাথে নিয়েছেন গণতন্ত্র বিরোধী ও গণবিচ্ছিন্ন বামপন্থিদের। আওয়ামী বাকশালীদের এরূপ গণবিরোধী ভূমিকার কারণে গণতন্ত্র চর্চায় তুরস্কো, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, তিউনিসিয়া, লেবানন, নাইজিরিয়ার মত মুসলিম দেশগুলি বহু এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ রয়ে গেছে ৪৪ বছর পূর্বের মুজিব-প্রবর্তিত স্বৈরাচারি বাকশালী জামানায়। তাদের কারণে বাংলাদেশীদের পিছিয়ে পড়াটি স্রেফ শিল্প, শিক্ষা, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানে সীমিত নয়, বরং সে ব্যর্থতাটি গণতান্ত্রীক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে না উঠায়। বাংলাদেশীদের আজকের পিছিয়ে পড়া নিয়ে বহুশত বছর পরও নতুন প্রজন্মের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন উঠবে এবং সে সাথে ধিক্কারও উঠবে, “আমাদের পূর্বপুরুষগণ কি এতই অসাধু ছিল যে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ন্যায় সভ্য কাজের সামর্থ্যও তাদের ছিল না? অভিযোগ উঠবে, জনগণ কি এতই অযোগ্য ছিল যে, ব্যর্থ হয়েছে গণতন্ত্রের শত্রু নির্মূলে?”

 

প্রশ্ন হলো, আগামী প্রজন্মের দরবারে সে ইজ্জতের ভাবনা কি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আছে? সে ভাবনা যে নাই –সেটিই প্রকাশ পাচ্ছে নানা ভাবে। সে ভাবনা থাকলে তো আজকের বিশ্ববাসীর সামনেও তারা নিজেদের ইজ্জত নিয়ে ভাবতো। আত্মসম্মানের সে ভাবনায় অসম্ভব হতো দূর্নীতিতে বাংলাদেশের ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়া। অসম্ভব হতো ভোটডাকাতি করা। তবে তেমন একটি সুস্থ্য ভাবনা না থাকার যথেষ্ঠ কারণও আছে। সেটি হলো, সভ্যতা, সম্মান  ও অগ্রগতি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অদ্ভুত বিপরীতমুখী ভাবনা ও মূল্যবোধ। সে ভ্রষ্ট ভাবনার কারণে বাকশালী স্বৈরাচারকে তারা যেমন গণতন্ত্র বলে, তেমনি ১৫৩ সিটে নির্বাচন না করাকেও সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে। এবং দেশের পিছিয়ে পড়াকেও অগ্রগতি বলে। গলা উঁচিয়ে আরো বলে, দেশ দ্রুত উন্নত দেশগুলির কাতারে শামিল হচ্ছে। এমন মানসিক বিকলাঙ্গগণ কি মানবতা বা গণতন্ত্রের বন্ধু হতে পারে? অথচ বাংলাদেশে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যারা নিরেপক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেছিল - তারা বিদেশী ছিল না। তারা এদেশেরই সন্তান ছিল। কিন্তু সেরূপ নির্বাচন এজন্যই সম্ভব হয়েছিল যে সেগুলি আওয়ামী বাকশালীদের দখলদারিতে অনুষ্ঠিত হয়নি, হয়েছিল নির্দলীয় কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে। তেমন একটি সভ্য নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ না থাকাতে এটিই প্রমাণিত হয়, দেশ আজ কতটা অশুভ ও অসভ্য শক্তির হাতে অধিকৃত।

 

চেতনায় রাজতন্ত্র

অসভ্যতার যেমন সুস্পষ্ট প্রকাশ আছে, তেমনি আছে সভ্যতারও। স্বৈরাচার যেমন অসভ্যতার প্রতীক, তেমনি সভ্যতার প্রতীক হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মৌলিক মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচা। দেশ কতটা উন্নত বা পশ্চাদপদ, সভ্য বা অসভ্য –সে বিচারটি নির্ভূল ভাবে হয় মতপ্রকাশ, ধর্মপালন, রাজনীতি ও ভোট দানের স্বাধীনতা থেকে। চলাফেরা, ঘর বাঁধা, খাওয়া-পড়া, চাষাবাদের স্বাধীনতা এমন কি ঔপনিবেশিক বিদেশী শত্রুশক্তিও অতীতে কেড়ে নেয়নি। এরূপ স্বাধীনতা যেমন দেশের পশুপাখি পায়, তেমনি পায় জনগণও। কিন্তু দখলদার শত্রুশক্তি কেড়ে নেয় স্বাধীন মতপ্রকাশ, সভাসমিতি ও রাজনীতির ন্যায় সভ্য মানুষ রূপে বাঁচার মৌলিক অধিকার। তাই স্বৈরশাসকদের  আমলে ঘরবাড়ী, দোকানপাঠ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও স্কুল-কলেজ নির্মিত হলেও তাতে নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচাটি নিশ্চিত হয় না। তেমনি স্বৈরশাসকদের আমলে বার বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হলেই তাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয় না; সেজন্য জরুরী হলো মত প্রকাশ, দল গঠন ও নির্বাচনে  অংশ নেয়ার অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার অধিকার। সেটি আসে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়। একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই প্রতিষ্ঠা পায় এক দল, এক মত ও এক নেতার বদলে নানা নেতা, নানা মত ও নানা দলের মূক্ত রাজনীতি। কিন্তু সে স্বাধীনতা আওয়ামী বাকশালীগণ মুজিব আমলে যেমন দেয়নি, হাসিনার আমলেও দিচ্ছে না।

 

গণতন্ত্রের মূল কথা, রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণে সবারই সমান অধিকার। কারো কোন বাড়তি অধিকার থাকে না। যে সম-অধিকার যেমন একজন ধনীর, তেমনি একজন গরীবেরও। ফলে নির্বাচনে কেউ যেমন দু’টি ভোটের অধিকারী নয়; তেমনি কেউ স্পেশালও নয়। স্বৈরাচারি রাজাবাদশাহদের ন্যায় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এখানেই শেখ হাসিনার প্রচণ্ড ক্ষোভ। কারণ, গণতান্ত্রিক চেনতায় বিলুপ্ত হয় তাঁর নিজের স্পেশাল অধিকার। তিনি তো সাধারণ মানুষ নন। তাঁর পিতা তো জাতির পিতা। সেরূপ এক পিতার সন্তান রূপে তাঁর অধিকার তো সবার উপরে। দেশ-শাসনের অধিকার তো একমাত্র তাঁরই। রাজার সন্তানেরাই তো রাজা হয় –চেতনায় রাজতন্ত্র থাকায় শেখ হাসিনা নিজের ও নিজ পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্রের তহবিল থেকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার খরচ ও প্রহরার ব্যবস্থা আদায় করেছেন। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেরূপ বাড়তি অধিকার কারো থাকে না, নিরাপত্তার অধিকারটি এখানে সবার সমান। অথচ বাংলাদেশে জনগণের জীবনে সে নিপরাপত্তার অধিকার আজ সমাহিত। ফলে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার নিরাপত্তা পেলেও হাজার হাজার বাংলাদেশী লাশ হচ্ছে, গুম  হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে এবং পুলিশের হাতে  নির্যাতিত হচ্ছে। জনগণকে সমান ভোটাধিকার দিলে তো হরণ হয় শেখ মুজিবে কণ্যা সূত্রে তাঁর নিজের অগ্রাধিকার। তাই রাজা-বাদশাহদের ন্যায় শেখ হাসিনাও জনগণকে ভোটাধিকার দিতে রাজী নন। তাঁর ভয়, জনগণকে সে অধিকার দিলে অতীতের ন্যায় সে অস্ত্র আবারো ব্যবহৃত হবে তাঁর অপসারণের কাজে। এমন একটি ভীতি নিয়েই তিনি জনগণের হাত থেকে ভোটের অস্ত্রটি ছিনিয়ে নিয়েছেন। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এরূপ নাশকতায় তিনি স্রেফ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেই ধ্বংস করেননি, জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলিকেও আবর্জনার স্তুপে ফেলেছেন। তেমন একটি গণবিরোধী ধারণার কারণেই ১৫৩ আসনে নির্বাচন না করাটি তার কাছে আদৌ অপরাধ গণ্য হয়নি। অপরাধ গণ্য হয়নি এমন এক নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রি হওয়ার ভিত্তি রূপে গ্রহণ করায় যে নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট দেয়নি।

 

স্ট্রাটেজী ভোটডাকাতির

ডাকাতি সফল করতে ডাকাতগণ প্রথমে গৃহ  বা দোকানের উপর সশস্ত্র অধিকার জমায়। তারপর অর্থের ভাণ্ডারে হাত দেয়। বাংলাদেশে তেমন একটি স্ট্রাটেজী ভোট-ডাকাতদেরও। ডাকাতগণ প্রথমে দখলে নেয় ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশন। এরপর ভোটের দিনে অধিকৃত ভোটকেন্দ্রে কাঙ্খিত ব্যক্তির পক্ষে সিল মারা শুরু করে। তখন সহজ হয়, দেড় লাখ বা দুই লাখ ভোটের বিনিময়ে সরকারি দলের প্রার্থীর বিজয়ী হওয়াটি। খুলনা ও গাজিপুরের পৌর নির্বাচনে তো সেটিই হলো। এরূপ এক অধিকৃত অবস্থায় নির্বাচন বার বার হলেও জনগণ যাদের নির্বাচিত করতে চায় তারা কখনোই নির্বাচিত হয় না। বরং নির্বাচিত হয় তারাই যাদেরকে স্বৈর-শাসক নির্বাচিত রূপে দেখতে চায়। সে ফয়সালাটি তাই ভোট কেন্দ্রে হয় না। এজন্যই ভোট-ডাকাতদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে জনগণের কাছে ভোট চাইতে হয় না; তারা ফসল ঘরে তোলে ভোটকেন্দ্রে ডাকাতি করে। তাই ২০১৪ সালে নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে  ক্ষমতাসীন দলের ভোট-ডাকাতগণ জনগণ থেকে একটি ভোট নেয়ারও প্রয়োজন বোধ করেনি। এরূপ নির্বাচনকে কি নির্বাচন বলা যায়? এরূপ ডাকাতির নির্বাচনে জনগণ শুধু ভোটহীনই হয় না, শক্তিহীন এবং ইজ্জতহীনও হয়। নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ একটি অপরাধী সরকারকে শাস্তি দিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে জনগণের সে অধিকার ছিনতাই হয়েছে হাসিনার হাতে। ফলে তাঁর জবাবদেহীতার কোন ভয় নাই। ফলে তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে ইচ্ছামত অবাধ গুম, খুন ও লুণ্ঠনের রাজত্ব কায়েম করা। এবং সম্ভব হচ্ছে রিম্যান্ডে নিয়ে মানুষের উপর দুঃসহ নির্যাতন করা।

 

নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য যা অপরিহার্য তা হলো, সেরূপ একটি নির্বাচনের জন্য সরকারের খালেছ নিয়েত। প্রয়োজন হয়, নিরপেক্ষ একটি প্রশাসনের। কিন্তু এর কোনটিই স্বৈরশাসকদের থাকে  না। যা থাকে তা হলো স্রেফ নিজের দলকে বিজয়ী করার ষড়যন্ত্র। ফলে স্বৈরশাসকদের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিছক এক অলীক স্বপ্নে পরিণত হয়। ফলে যে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন মিশর, সিরিয়া এবং সাদ্দামের আমলে ইরাকে দেখা গেছে -সেটিই এখন বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে। তাই গাজীপুরের পৌর নির্বাচনে প্রশাসনের কর্মচারীদের দেখা গেল ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর অনুকুলে ব্যালটে সিল মারতে। খুলনার নির্বাচনেও একই ভাবে তারা সরকারি দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করেছে। এরূপ ভোট ডাকাতি পূর্বে কখনো হয়নি। আগে ভোট ডাকাতিতে অংশ নিত দলীয় কর্মীগণ; এবং তাতে সরকারি কর্মকর্তাগণ সাধ্যমত বাধা দিত। কিন্তু খুলনা ও গাজীপুরে দেখা গেল, ভোট ডাকাতির কৌশলই  পাল্টে গেছে। রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বদলে তাদের পক্ষে সিল মারার দায়িত্ব পালন করেছে সরকারি কর্মচারিগণ। ছবিতে দেখা গেছে, ভোটকেন্দ্রের ভিতরে ঢুকে তদারকি করেছে আওয়ামী লীগের ক্যাডারগণ।

 

দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় থাকায় প্রশাসনের দলীয় করণের পূর্ণ সুযোগ পেয়েছে আওয়ামী লীগ। সমগ্র সরকারি প্রশাসনকে তারা পরিণত  করেছে সরকারি দলের চাকর-বাকরে। দলীয় করণের সে ফসলই এখন তারা উৎসব ভরে ঘরে তুলছে। দলীয় করণের ফলে সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগ পরিণত হয় স্বৈরশাসকের ডাকাত বাহিনীতে। সে সরকারি ডাকাত বাহিনীর তৎপরতাটি দেখা গেছে ২০১৩ সালের ৫ই মে’তে শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের কয়েক শত কর্মীকে হত্যা ও হত্যার পর তাদের লাশ গুমের কাজে। দেখা যায়, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও কোটাবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের কর্মীদের উপর জুলুমবাজীর ক্ষেত্রে। এরূপ ডাকাতবাহিনীর কারণে নির্বাচন পরিণত হয়েছে নিছক প্রহসনে। এজন্যই নির্বাচনের মাধ্যমে কখনোই ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসককে উৎখাত করা যায় না। একই কারণে স্বৈরাচারি এরশাদকেও ভোটের মাধ্যমে উৎখাত করা যায়নি। ভোটের মাধ্যমে অপসারণ করা যায়নি মিশরে হোসনী মোবারক ও তিউনিসার বিন আলীকেও। কারণ, নির্বাচনি কমিশন, প্রেজাইডিং অফিসার, ভোট কেন্দ্রের পাহারাদার –এদের কেউই নিজেদেরকে ক্ষমতাসীন স্বৈর-সরকারের বেতনভোগী চাকর-বাকর ছাড়া বড় কিছু ভাবেনা। নির্বাচন কালে তাদের উপরে অর্পিত দায়িত্ব-পালন নিয়ে চাকর-বাকরের ন্যায় তারাও তাই অতি অনুগত ও অঙ্গিকারবদ্ধ থাকে। তারা জানে, ভোটকেন্দ্রে তাদের মূল দায়িত্বটি হলো, সরকারি দলের প্রার্থীকে যে কোন ভাবে বিজয়ী করা। তারা এটাও জানে, সরকারি  দলকে বিজয়ী করার মধ্যেই তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার। খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনে সরকারি কর্মচারিগণ তো সে আনুগত্যেরই প্রদর্শন করেছে।

 

অপরাধীদের অভয় অরণ্য

যখন বিচারেরর ভয় থাকে না তখন দেশ পরিণত হয় অপরাধীদের অভয় অরণ্যে। তখন অপরাধীগণ নৃশংস অপরাধ ঘটায় কোনরূপ বিচারের ভয় না রেখে। তখন অপরাধের আলামত গোপন করাও তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। বরং নিজেদের অপরাধকে তারা তখন বেশী বেশী জনসম্মুখে প্রকাশ করে এবং তা নিয়ে বাহাদুরি জাহির করে। জনসম্মুখে রাস্তায় মানুষ খুন করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্র হাতে ছাত্রদের লাশ করা ও ধর্ষণ নিয়ে উৎসব করা, ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে দলবল নিয়ে স্বদর্পে আড্ডা দেয়া এবং প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারাও অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশকে অপরাধীদের জন্য তেমনি এক অভয় অরণ্যে পরিণত করেছেন। তাই সরকারি দলের ক্যাডারগণ ভোট ডাকাতিকেও গোপন রাখতে আগ্রহ দেখায় না। গাজীপুরের পৌর-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দুই লাখেরও বেশী ভোটে বিজয়ী হয়েছে। ভোটবাক্সে যদি আরো দুই লাখ জাল ভোট ঢেলে ৪ লাখের ব্যবধানে বিজয়ী হতো তবুও তা নিয়ে কোন বিচার বসতো না। তখনও নির্বাচনি কমিশনের পক্ষ থেকে সার্টিফিকেট মিলতো অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের।

 

বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের বিজয়ই বলে দেয়, একমাত্র ভোট-ডাকাতিই এমন ফলাফল সম্ভব। কারণ, দুই বা তিন লাখ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার জন্য ভোটারদের ভোট লাগে না। লাগে শুধু ব্যালটে সিল মারা। সে কাজটি সরকারি কর্মচারিগণ সহজেই করতে পারে। ডাকাতির সুবিধার্থে নির্বাচনের আগে বিএনপি’র স্থানীয় নেতাকর্মীদের গ্রফতার করা হয়। ভোটের দিন বহু ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। সে অভিযোগটি যেমন বিএনপি’র দলীয় প্রার্থীর, তেমনি বিবিসি’র রিপোর্ট। আর এভাবে ভোটকেন্দ্র থেকে বিরোধী প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে বের করে দিলে ব্যালটে সিল মারার কাজে বাধা দেয়ার কেউ থাকে না। ভোট ডাকাতির এটাই তো সনাতন রীতি।

 

ভোটকেন্দ্রগুলো ভোটডাকাতদের জন্য কতটা অভয় অরণ্যে পরিণত হয়েছিল তার বিবরণ দিয়েছেন বিবিসি’র সংবাদদাতা। তিনি গাজীপুরের  ৪২৫টি কেন্দ্রের মাঝে ১০টিতে গেছেন। ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে তিনি আওয়ামী লীগের কর্মীদের ব্যাজ লাগিয়ে জটলা পাকাতে দেখেছেন। অথচ ভোটকেন্দ্রগুলি কোন দলীয় অফিস নয়। প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ছাড়া সেখানে অন্য কারো উপস্থিতি অবৈধ ছিল। অথচ নির্বাচন চলা কালে সরকারি দল সেটিকে দলীয় অফিসে পরিণিত করে। ফলে সেখানে তিনি দলীয় ক্যাডারদের দম্ভভরে জটলা পাকাতে দেখা গেছে। বিবিসির সংবাদদাতা সেখানে স্বচক্ষে দেখেছেন প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারতে। অথচ ভোটদানের বৈধ রীতি হলো, ভোটার নিজে গোপনে তার নিজের ব্যালটে সিল মারবে এবং ভোটের বাক্সে নিজে ব্যালটটি ফেলবে। বিবিসি’র সংবাদদাতা অধিকাংশ কেন্দ্রে বিএনপি’র পোলিং এজেন্টদের দেখেননি। কোন কোন কেন্দ্রে কারণ রূপে বলা হয়েছে, বিএনপি’র পোলিং এজেন্ট টয়লেটে গেছেন এবং এখনি ফিরবেন। কিন্তু বহুক্ষণ অপেক্ষার পরও বিবিসি’র সংবাদদাতা বিএনপি’র কোন পোলিং এজেন্টকে টয়লেট থেকে ফিরতে দেখা যায়নি। এ হলো ভোটকেন্দ্রগুলির উপর আওয়ামী লীগের দখলদারির চিত্র।

 

সাপ্তাহিক “হলি ডে” রিপোর্ট করেছে, নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতে ৪০টি সেন্টারে ভোট পড়েছে শতকরা ১৪ ভাগ থেকে ৪১ ভাগ। এবং ৬১টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে শতকরা ৭৩ থেকে ৯৪ ভাগ। গাজিপুরের হলি  সন কিন্ডার গার্ডেনে ভোট পড়েছে ১৪.৪% এবং বাসুয়া মকতব মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৪%। একই আসনের এক জায়গায় ভোট পড়বে শতকরা ১৪.৪ ভাগ এবং আরেক জায়গায় শতকরা ৯৪ ভাগ -সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? বাংলাদেশের কোন নির্বাচনি আসনে ভোটদানে কি এরূপ তারতম্য কখনো পূর্বে দেখা গেছে? এরূপ তারতম্য সৃষ্টি হয়েছে হটাৎ সে ভোট কেন্দ্রে ভোটার পক্ষ থেকে কোন জোয়ার সৃষ্টির কারেণ নয়, বরং সেটি হয়েছে জাল ভোটের জোয়ারে। তবে প্রশ্ন হলো, ভোট ডাকাতির আলামত যত সুস্পষ্টই হোক সেটির বিচার কে করবে? সেটি কি তারা যারা এ ডাকাতির সর্দার? এখানেই স্বৈর-শাসনের মূল আযাব। ডাকাত সর্দার যেমন তার দলের ডাকাতদের বিচার করে না, তেমনি স্বৈর-শাসকও তার দলের লোকদের বিচার করে না। ফলে ছাত্রলীগের কর্মী ধর্ষণে সেঞ্চুরি করলেও সে অপরাধে তাকে শাস্তি পেতে হয়নি। বরং কোথাও কোন দলীয় কর্মীর শাস্তি হলে শেখ হাসিনার এজেন্ডা হয় প্রেসিডেন্টকে দিয়ে সেটি মাফ করিয়ে নেয়া। শেখ হাসিনার রাজনীতিতে নিজ দলের খুনের অপরাধে শাস্তিপ্রাপ্তদের মুক্তি দেয়াটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ নিজের আত্মজীবনীতে সেটির বিবরণ দিয়েছেন এরশাদের এক সময়ের প্রধান মন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান। ছাত্রলীগের খুনীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের দুইজন কর্মীকে অতি নৃশংস ভাবে খুন করেছিল। তাদের মাথা ইটের উপর রেখে ইট দিয়ে গুতিয়ে গুতিয়ে। বিচার এ খুনিদের শাস্তি হয়েছিল। জনাব আতাউর রহমান খান লিখেছেন, এরশাদের সাথে বৈঠক করতে এসে শেখ হাসিনা শর্ত দিয়ে বসলেন তাদের মুক্তি না দিলে তিনি বৈঠকে বসবেন না। হাসিনার কথা, তাদের দলের কর্মীরা যতই নৃশংস খুনিই হোক তাদের শাস্তি দেয়া যাবে না। এমন ব্যক্তি ক্ষমতায় বসলে ন্যায় বিচার কবরে যাবে, নিরাপরাধীরা ফাঁসিতে ঝুলবে এবং খুনিরা রাজপথে উৎসব করবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

 

সিলেকশন নির্বাচনের নামে

বাংলাদেশের নির্বাচনে কে কত ভোট নিয়ে জিতবে এবং সংসদে কোন দল কতটি আসন পাবে -সেটি আর জনগণের হাতে নেই। সে বিষয়টি দেশের  স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে। খুলনা ও গাজীপুরের পৌর নির্বাচনে তারই মহড়া হলো। ব্যালট পেপার যেমন হাসিনা সরকার যত ইচ্ছা তত ছাপতে পারে, তেমনি ইচ্ছামত তাতে সিলও মারতে পারে। কে জিতেছে সেটিও তারা ইচ্ছামত ঘোষণা দিতে পারে। এর উপর কারো কোন নিয়ন্ত্রণ নাই। নির্বাচন কমিশনারও তাই বলে যা স্বৈর সরকার নিজে বলতে চায়। স্বৈর সরকারের সাথে গলা মিলিয়ে তাই নির্বাচন কমিশনারও ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে।

 

বাংলাদেশের নির্বাচন পরিণত হয়েছে স্বৈরশাসনের পরিকল্পনা মাফিক সিলেকশনের হাতিয়ারে। নির্বাচনের নামে নির্বাচন যে কতটা অকেজো হতে পারে -বাংলাদেশের নির্বাচন হলো তারই নমুনা। বাংলাদেশ অতীতে ৫ বার দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে। এখন সে দুর্বৃত্তির উর্বর ক্ষেত্র হলো বাংলাদেশের নির্বাচন। সংসদ ও তার আসনগুলি পরিণত হয়েছে শেখ হাসিনার লুটের মালে। সে মালে কিছু ভাগ দিয়ে এরশাদকে তিনি গণতন্ত্র নির্মূলের যুদ্ধে কলাবোরেটর বানিয়েছেন। এরূপ সিট উপহার দিয়ে আগামী নির্বাচনেও হয়তো অনেককে টানবেন। ক্ষমতায় থাকার জন্য ৩০০ সিটের সংসদে ১৬০ আসনই যথেষ্ট। ১৬০ আসনের জোরে তিনি  অধিকাংশ মহিলা সিটের মালিক হবেন। ফলে বাঁকি ১৪০ আসন বিলিয়ে তিনি অনেককেই তার গৃহপালীত বিরোধী দলের সদস্য করতে পারবেন। তেমন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে হামলা হবে বিরোধী শিবিরের অনেক দলের উপরই। আর এরূপ গৃহপালীত বিরোধী দলের সহযোগিতায় বাঁচবে তার স্বৈরশাসনও। হয়তো আগামী নির্বাচনেও তেমনি একটি নীল নকশার বাস্তবায়ন করবে শেখ হাসিনা।

 

এরূপ অভিন্ন স্ট্রাটেজী ছিল স্বৈরাচারি এরশাদের। বস্তুতঃ সব স্বৈরশাসকের একই নীতি। তাই গণতন্ত্রের জন্য শত্রু শুধু স্বৈরশাসক নয়, স্বৈরশাসকের ছত্রছায়ায় প্রতিপালিত বিরোধী দলও। তাই স্বৈরশাসনের আযাব থেকে মুক্তি আনতে হলে শুধু স্বৈর শাসকদের নয়, গৃহপালিত বিরোধী দলের নিপাতটিও অপরিহার্য। বুঝতে হবে জনগণের শত্রু শধু স্বৈরশাসকের প্রাসাদে বাস করে না, বাস করে যেমন গৃহপালিত মিডিয়ায়, তেমনি রাজপথেও। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বাঁচানোর চ্যালেঞ্জটি বিশাল। এ চ্যালেঞ্জটি বিশ্বমাঝে সভ্যতর পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠার। এমন বেড়ে উঠার পথে দেশের সকল অসভ্য শক্তি বাধা দিবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশে এরূপ অসভ্য শক্তির ভিত্তিটা তো বিশাল। মানুষের ঈমানের পরীক্ষা হয় তো সে বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মধ্য দিয়ে। আগামী নির্বাচন মূলতঃ সে চ্যালেঞ্জ নিয়েই হাজির হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগামী নির্বাচন তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মৃত গণতন্ত্র আবার প্রাণ ফিরে পাবে কিনা -সেটি নির্ধারিত হবে এ নির্বাচনে। ১৫/৭/২০১৮  Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Sunday, 15 July 2018 17:11
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2018 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.